বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম,
হায়েযের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে কোনো বস্তু নির্গত ও প্রবাহিত হওয়া।

হায়েয কী?

আর শরীয়তের পরিভাষায় হায়েয বলা হয় ওই প্রাকৃতিক রক্তকে, যা বাহ্যিক কোনো কার্যকারণ ব্যতীতই নির্দিষ্ট সময়ে নারীর যৌনাঙ্গ দিয়ে নির্গত হয়।
হায়েয প্রাকৃতিক রক্ত। অসুস্থতা, আঘাত পাওয়া, পড়ে যাওয়া এবং প্রসবের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এই প্রাকৃতিক রক্ত নারীর অবস্থা ও পরিবেশ-পরিস্থিতির বিভিন্নতার কারণে নানা রকম হয়ে থাকে এবং এ কারণেই ঋতুস্রাবের দিক থেকে নারীদের মধ্যে বেশ পার্থক্য দেখা যায়।

সাধারণত ৯ বছরের আগে এই রক্ত দেখা দেয় না। ৯ বছরের আগে এই রক্ত দেখা দিলে তা এস্তেহাজা বা অসুস্থতার রক্ত বলে গণ্য হবে। তেমনি ৫৫ বছরের পর কোনো নারীর হায়েয দেখা দেয় না। তখন রক্ত দেখা দিলে তা যদি লাল বা কালো রঙের হয় তবে তা হায়েয কিন্তু রঙ হলুদ বা ধুসর মাটির মত হলে তা এস্তেহাজা বলে গণ্য হবে।

হায়েযের সময়-সীমা:

হায়েয এর সময়সীমা সর্বনিম্ন ৩দিন ৩ রাত এবং সর্বাধিক ১০দিন ১০ রাত। হায়েয এর সময় রক্ত সবসময় প্রবাহিত না হয়ে কিছু সময় পর পর প্রবাহিত হলেও তা হায়েয বলে গণ্য হবে। ৩ দিন ৩ রাতের কম বা ১০ দিন ১০ রাতের বেশি রক্ত স্রাব হলে তাকে এস্তেহাজা’র রক্ত বলে গণ্য করা হবে। (তুহফায়ে খাওয়াতীন)

হায়েয অবস্থায় নামাজ:

হায়েয এর সময়গুলোতে নামাজ পড়া নিষেধ। নামাজ পুরোপুরি মাফ হয়ে যায় এবং পরে কাজা করতে হয় না কিন্তু রোজা সাময়িকভাবে বাদ হয় এবং পরে রোজার কাজা আদায় করে নিতে হয়। এছাড়া ওয়াক্তের নামাজ এখনো আদায় করেন নি কিন্তু নামাজ পড়ার সময় এখনো আছে এই অবস্থায় হায়েজ শুরু হলে সেই ওয়াক্তের নামাজ মাফ হয়ে যাবে। নামাজের শেষ ওয়াক্তে হায়েজ হয়েছে কিন্তু এখনও যদি নামাজ না পড়ে থাকেন তাহলে সেটারও ক্বাযা পরতে হবে না।

যদি কারো ১০দিন এর কম স্রাব হয় এবং এমন সময়ে গিয়ে রক্ত বন্ধ হয় যে খুব তাড়াতাড়ি গোসল করে নেয়ার পর একবার আল্লাহু আকবর বলার সময় থাকে, তবে সেই ওয়াক্তের নামাজ পড়তে হবে। এমন অবস্থায় নামাজ শুরু করার পর ওয়াক্ত শেষ হয়ে গেলেও নামাজ শেষ করতে হবে। তবে ফজরের ওয়াক্ত হলে যদি নামাজ শুরু করার পর সূর্য উদিত হয়ে যায় তবে সে নামাজ কাজা করতে হবে। (সূত্র: হেদায়া, হায়েজ অধ্যায়।)

হায়েয অবস্থায় পবিত্র কোরআন পড়া, কোরআন শেখানো:

হায়েজ অবস্থায় যেমনিভাবে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করা না জায়েয, তদ্রুপ কাউকে শেখানোর উদ্দেশ্যেও পড়া নাজায়েয। তাই হায়েজ অবস্থায় যাতে মহিলা শিক্ষিকাদের পবিত্র কোরআন পড়াতে না হয় এ ব্যবস্থা রাখা জরুরি। এ ধরণের সুব্যবস্থা হওয়ার আগ পর্যন্ত হায়েয অবস্থায় যদি কখনো বাচ্চাদেরকে পবিত্র কোরআন শরীফ পড়ানো জরুরি হয়, তাহলে শব্দে শব্দে থেমে কিংবা বানান করে পড়াবে। এ ছাড়া নিজে মুখে উচ্চারণ না করে বাচ্চাদেরকে দিয়ে পড়িয়ে শুধু ভুল জায়গা ধরিয়ে দিতে পারবে। (তথ্যসূত্র: খুলাসাতুল ফাতাওয়া, ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া, ফাতহুল কাদীর)

হয়েয অবস্থায় পবিত্র কোরআনের আয়াত লেখা:

হয়েয অবস্থায় পবিত্র কোরআনের আয়াত লেখা থেকে বিরত থাকা জরুরি। তবে একান্ত প্রয়োজন দেখা দিলে আয়াতের লিখিত অংশে হাত না লাগিয়ে লেখা যেতে পারে। (তথ্যসূত্র: ফাতহুল কাদীর, ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া)

হায়েয অবস্থায় তাসবীহ-তাহলীল, জিকির-আযকার, দোয়া-দরুদ পড়া:

মাসিক চলাকলীন সময় জিকির-আযকার করা, দরুদ শরীফ পড়া, ওযীফা পড়া, বিভিন্ন দোয়া পড়া যায়। এমনকি এসময় পবিত্র কোরআনে কারীমের দোয়ার আয়াতগুলোও দোয়া হিসেবে পড়া যাবে। পবিত্র কোরআনের তিলাওয়াত হিসেবে পড়া যাবে না। এক বর্ণনায় এসেছে, মা‘মার (রাহ.) বলেন, আমি যুহরী (রাহ.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, ঋতুমতী নারী ও যার ওপর গোসল ফরজ হয়েছে সে আল্লাহর যিকির করতে পারবে? তিনি বললেন, হাঁ, পারবে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কোরআন তিলাওয়াত করতে পারবে? তিনি বললেন, না। (মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হাদীস ১৩০২)

ইবরাহীম নাখায়ী (রাহ.) বলেন, ঋতুমতী নারী ও যার ওপর গোসল ফরজ হয়েছে সে আল্লাহর যিকির করতে পারবে এবং বিসমিল্লাহও পড়তে পারবে। (মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হাদীস ১৩০৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/৩৮; তাবয়ীনুল হাকায়েক ১/১৬৫)

হায়েয অবস্থায় সহবাস:

পবিত্র কোরআন ও হাদীসে এ সময়ে সহবাস করতে পরিস্কার নিষেধাজ্ঞা এসেছে। মহান আল্লাহ বলেন, আর আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে হায়েয সম্পর্কে। বলে দেন, এটা অশুচি। কাজেই তোমরা হায়েয অবস্থায় স্ত্রীগণ থেকে বিরত থাকো এবং যতক্ষন না তারা পবিত্র হয়ে যায় ততক্ষণ তাদের নিকটবর্তী হবে না। যখন উত্তমরূপে পরিশুদ্ধ হয়ে যায়, তখন গমন কর তাদের কাছে, যে ভাবে আল্লাহ হুকুম দিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারী এবং যারা অপবিত্রতা হতে বেঁচে থাকে তাদেরকে পছন্দ করেন। (বাকারা/আয়াত-২২২)

হজরত আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো ঋতুবতীর সঙ্গে মিলিত হয় কিংবা কোনো মহিলার পশ্চাৎদ্বারে সঙ্গম করে অথবা কোনো গণকের নিকটে যায়, নিশ্চয়ই সে মুহাম্মাদের ওপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তা অস্বীকার করে’। (তিরমিযী, হাদীস নং-১৩৫, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-৬৩৯, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-৯২৯০)

সুতরাং স্বামীর জন্য জায়েয হবে না স্ত্রী সহবাস করা যতক্ষন না স্ত্রী হায়েয থেকে মুক্ত হয়ে গোসল করে পবিত্র হয়।
এছাড়া ডাক্তারদের মতেও এ সময় স্ত্রী সহবাস করা অনুচিত। কারণ এ সময় নারীরা অসুস্থ্য বোধ করে। স্রাবের রক্তের সঙ্গে বিভিন্ন রোগের জীবানু বের হয়ে থাকে। যা সহবাসের মাধ্যমে পরস্পরের মাঝে ছড়িয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দেয়। তাই শরীয়তের বিধানের পাশাপাশি ডাক্তারী মতেও এ সময় সহবাস করা থেকে বিরত থাকাই কর্তব্য।

হায়েজ অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করলে এক নম্বর ক্ষতি হলো, মহান আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিধানকে লঙ্ঘণ করা হয়। এর চেয়ে বড় ক্ষতি আর কিছুই হতে পারে না। যে কর্মের মাধ্যমে মহান রাব্বুল আলামীন অসন্তুষ্ট হোন। তার বিধান লঙ্ঘিত হয়। এর চেয়ে ক্ষতি আর কী হতে পারে?

হায়েয অবস্থায় সহবাসের কাফফারা:

হায়েজ অবস্থায় যদি কেউ যৌনমিলনে লিপ্ত হয় তবে তার ওপর এই পাপের কাফফারা আদায় করা ওয়াজিব হয়ে যাবে। কাফফারার পরিমাণ হলো এক দীনার অথবা অর্ধ দীনার। এ ক্ষেত্রে দলীল হলো, আবু দাউদ বর্ণিত একটি হাদীস। কোনো কোনো আলেম হাদীসটিকে দুর্বল বলেছেন। কিন্তু বিশুদ্ধ মত হলো, হাদীসটির বর্ণনা কারীরা সকলেই নির্ভর যোগ্য। সুতরাং দলীল হিসেবে উহা গ্রহণযোগ্য।

এই কাফফারা ওয়াজিব হওয়ার শর্ত হল:

(১) ব্যক্তির জ্ঞান থাকা। (যে হায়য অবস্থায় ইহা হারাম) (২) স্মরণ থাকা। (ভুল ক্রমে নয়) এবং (৩) ইচ্ছাকৃতভাবে সে কাজে লিপ্ত হওয়া। (কারো জবরদস্তী করার কারণে নয়।) যদি উক্ত কাজে স্বামীর অনুগত হয় তবে তারও ওপর উক্ত কাফফারা ওয়াজিব হবে।

ওষুধ খেয়ে হায়েয বন্ধ রেখে রোজা রাখা ও সহবাস করা:

ট্যাবলেট খেয়ে মাসিক বন্ধ করে রোজা রাখলে রোজা হয়ে যাবে। ট্যাবলেট দ্বারা হায়েয বন্ধ হলে স্বামীর সঙ্গে মেলামেশাও করতে পারে। তবে মেয়েদের স্বাভাবিক অবস্থায় বিরুদ্ধে এ নিয়মে শরীরের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। তাই ট্যাবলেট না খাওয়াই উত্তম। বরং, স্রাব চালু থাকতে দিবে এবং পরবর্তীতে রোজা কাজা করে নিবে। মনে রাখবেন, এতে রমজানের রোজার সওয়াব কমবে না।

নারীদের হায়েয অবস্থায় রোজা পালন:

হায়েয অবস্থায় মেয়েদের জন্য ওয়াজিব হলো রোজা বর্জন করা। এ অবস্থায় রোজা আদায় করা জায়েয হবে না। সুস্থতার পর তাদের রোজা কাজা আদায় করতে হবে। সালাতের কাজা আদায় করতে হবে না। হাদীসে এসেছে, উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা:) থেকে বর্ণিত যে, তাকে জিজ্ঞেস করা হলো হায়েজ থেকে পবিত্রতার পর মহিলারা কি নামাজ ও রোজার কাজা আদায় করবে? তিনি বললেন: ‘এ অবস্থায় আমাদের রোজার কাজা আদায় করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে সালাতের নয়।’ (বুখারী ও মুসলিম)

হায়েয অবস্থায় তাওয়াফ ও মসজিদে যাওয়া:

হায়েয অবস্থায় তাওয়াফে জিয়ারত জায়েজ নেই। এমনকি তাওয়াফের জন্য মসজিদে হারামের ভিতরে প্রবেশ করাও জায়েজ নেই। যদি তাওয়াফ করাবস্থায় হায়েজ শুরু হয়ে যায়, তাহলে তৎক্ষণাৎ তাওয়াফ বন্ধ করে দেবে এবং পরবর্তীতে পবিত্র হওয়ার পর কাজা করবে। (কিতাবুল মাসায়েল : ৩ : ৪০৩)

রাসূলুল্লাহ (সা.) মা আয়েশা (রা:)-কে বলেছিলেন, ‘হজ্জ সম্পাদনকারী একজন ব্যক্তি যা করে তুমিও তা করতে থাক। তবে পবিত্রতা অর্জন পর্যন্ত পবিত্র ঘর কাবার তওয়াফ থেকে বিরত থাকবে।’ (বুখারী ও মুসলিম)

হায়েয অবস্থায় মসজিদেও গমন করা যাবে না। রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: ‘কোন ঋতুবতী এবং নাপাক ব্যক্তির জন্য (যার ওপর গোসল ফরজ) মসজিদে অবস্থান করা আমি বৈধ করিনি। (আবু দাউদ)।

By Anonto Rajan

রবের প্রতি বিশ্বাস সবসময়...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *